৪ঠা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, শুক্রবার, সকাল ৭:৫৪



আজ : ৪ঠা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ২১শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, শুক্রবার প্রকাশ করা : মার্চ ২৩, ২০২৫

  • কোন মন্তব্য নেই

    গায়ক যন্ত্রীক বিনোদ বিহারী বাংলার গানই যার প্রাণ

    গায়ক যন্ত্রীক বিনোদ বিহারী, ছবি – শিবু সাওজাল/নিউজনেক্সট।

    শিবু সাওজাল, মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি :

    গায়ক যন্ত্রিক বিনোদ বিহারী নামে জনে-মনে যার বহুল পরিচিতি।যার হাতে আছে যাদু কন্ঠে তার সুমধুর সুর। তার পুরো নাম বিনোদ বিহারী গাইন। পিতা সারদা গাইন। তিনিও মনে প্রাণে ছিলেন একজন কবিয়াল ও রয়ানী গানের প্রিয় গায়ক। মঠবাড়িয়া উপজেলার অন্তর্গত পৌরসভার ৩ নং ওয়ার্ডে তার নিজ বাড়ি।সেখানে তার আপন ভূবন তৈরী করেছে বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র আর তার প্রিয় কিছু স্নেহভাজন শিক্ষার্থীদের নিয়ে।

    তখন পরন্ত বেলা, শিল্পীর বাড়ি যাবো বলে মনস্তাপ। শহর থেকে হেটে যেতে সময় লাগে বিশ মিনিটের মত। যখন আমি বিনোদ গাইনের বাড়ি খবর নিয়ে জানলাম তিনি তখনো বৈকালীন ঘুমে। ডাকার পর, আমাদের কথা শুনে ঘুম থেকে জাগলেন।ঘরে গিয়ে বসলাম।শুরু হ’ল আলাপচারিতা। তার জন্ম মঠবাড়িয়ায়। তার দাদা তার বাবাকে নিয়ে মঠবাড়িয়া আসেন যখন,তখন চলছিল ইংরেজ শাসন ব্যবস্থা।

    তারপর থেকে মঠবাড়িয়ার আলো বাতাস আর সংস্কৃতি পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠা এলাকা আর পরিবারের সদস্যদের সাথে। তাদের পূর্ব পুরুষগন সর্পন পদবী নিয়ে পরিচিত ছিলেন। গান বাজনা, কবি ও রয়ানী গানে পারদর্শী ছিল সবাই। আশপাশের দুই দশ গ্রামে প্রায়ই বায়না পালা লেগে থাকতো তাদের।শিল্পীর সাথে কথা হচ্ছিল তার সংগ্রহে থাকা বাদ্যযন্ত্রগুলো নিয়ে। দেখলাম আপনার সংগ্রহে বিভিন্ন ধরণের বাদ্যযন্ত্র। সবগুলোতে কি আপনার দখল আছে? বিনোদ বিহারী হেসে বললেন, ছোট বেলা থেকেই এসবের ওপর আমার দুর্বলতা ছিল, যার কারণে দিনের পর দিন শুনে শুনে, দেখে দেখে নিজের ইচ্ছা শক্তিতে অনেক ভালো না পারলেও সবগুলোতেই কম বেশি দখল আছে।

    গুরুজী হর লাল ওস্তাদ (খোল) সতীশ চন্দ্র কির্ত্তনীয়া সুর শেখাতে আমাকে যথেষ্ট সময় দিয়েছেন।তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো যত দিন বেঁচে আছি। টানাপোড়েনের সংসারে খেটে খাওযা মানুষ ছিলাম। কিন্তু তাল আর সুর থেকে কখনো সরে যাইনি। যাত্রাপালা- রূপবান,বেদপঞ্চি, সাগর ভাসা, গরিবের মেয়ে, একটি পয়সা মঞ্চে মমঞ্চায়ন করে করে নিজের পরিচিতির স্থান করতে হয়েছে।ডাক পড়তো প্রফিশনাল পার্টির পক্ষ থেকে। আর সেই সুবাদে কিছু কিছু আয় রোজগার হোত। অভাব অনটনের সংসারে কিছু কিছু অর্থ বাঁচিয়ে ইচ্ছেগুলো পূড়ণ করার চেষ্টা করেছি।

    জিজ্ঞেস করলাম আপনার সংগৃহীত যন্ত্রগুলো সেকেলে এখন এর আবেদনতো অনেক কম।বিনোদ বিহারী বললেন,সেকেলে বলে কথা নেই, যন্ত্রে যদি সুর তোলা যায় সবকিছুরই আবেদন আছে! এক পর্যায় বলছিলেন, আমদের সময় যে রাগ – রাগিনীর ব্যবহার ছিলো বর্তমানে তার ব্যবহার দেখা যায়না, এখন কমে গেছে। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলো কিন্তু কথার পালা শেষ হচ্ছিলনা। বললাম, আর বেশি সময় নিবোনা। আপনার কাছ থেকে জানার ছিলো, বর্তমানে আপনি কেমন আছেণ?উত্তরে বিনোদ বিহরী জানালেন, আমি ভালো আছি, খুবই ভালো আছি।

    আমার এখন ছিয়াশি বছর বয়স। সবকিছুর সাথেই সময় কাটাই। মানুষের ভালোবাসায় এখনো আমি অনুষ্ঠান করি, কির্ত্তণ গান গাই, ঢোল বাজিয়ে মানুষের মন জয় করি। কখনো বেহালায় বেহাগ বাজাই, বেঞ্জুতে ঈমন, প্রভাত বেলা হারমোনিয়ামে ভৈরবী। প্রশ্ন করলাম আপনার পরিবারে কে কে আছেন? উত্তরে জানালেন, তিন ছেলে সন্তান, বড় ছেলে বিপুল গাইন- সঙ্গীত শিক্ষক,দ্বিতীয় ছেলে সমীর গাইন- মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ছোট ছেলে প্রবীর গাইন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বাংলাদেশ বেতার টেলিভিশনের নিয়মিত সঙ্গীত শিল্পী, ছোট ছেলের স্ত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সবশেষে আমি বিনীতভাবে কয়েকটি যন্ত্র বাজিয়ে শোনানোর জন্য অনুরোধ করলাম।

    প্রতিবেদকের অনুরোধ রাখতে শোনালেন, বেহালায় – সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের “মধুামালতী ডাকে আয়”, বেঞ্জুতে – “দাদা মেলা থেকে বউ এনে দে” ঢোল,খোল, দোতড়ায়- রবীন্দ্র সংগীত “গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ” মুগ্ধ হয়ে শুনলাম।

    ঘর থেকে বেরিয়ে আসার আগে মনে মনে বলছিলাম, গ্রাম বাংলার এ রকম হাজারো গুনী শিল্পীরা বাঁচিয়ে রাখুক বাংলার সুর ছন্দ- প্রকৃতি আর মানুষের আনন্দ!